wholesale jerseys and real Jerseys Wholesale

আবারও রব্বানী স্যার আর তার গ্রুপ-সস্তা পায়ের চাপ পরিমাপের যন্ত্র উদ্ভাবন

2013-07-28 03:16:45

ওবায়দুর রহমান
ওবায়দুর রহমান:
 
হাঁটার সময় আমাদের পায়ের নিচের সব অংশে শরীরের ওজন সব সময় সমান ভাবে পড়ে না। কারণ পায়ের তলার উপরিভাগ অসমতল, খানিকটা উচু-নীচু। কারো কারো এতটাই অসমতল যে, পায়ের তলার কিছু কিছু অংশে শরীরের চাপ বেশী পড়ায় সে অংশগুলোতে বিভিন্ন ধরনের উপসর্গ দেখা দেয়। একজন স্বাভাবিক মানুষ সেই অংশগুলোতে ব্যাথা অনুভব করে এবং চলার পথে সে তার পায়ের অবস্থান সুবিধামত স্থানে ফেলে শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণ করে চলে। কিন্তু ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হলে অনেক সময় পায়ের স্নায়ু দূর্বল হয়ে যায়। এর ফলে আক্রান্ত স্থান অসাড় হয়ে পড়ে, এবং তীব্র চাপ বা ব্যাথাও টের পাওয়া যায় না। আক্রান্ত স্থানের কোষগুলো মরে যেয়ে সেখানে আলসার বা ঘা হয় যা থেকে পায়ের রক্তবাহী নালীগুলোতে শুরু হয় ইনফেকশন। যথাযথ চিকিৎসা ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে এটিই গ্যাংগ্রীনে পরিণত হয়। এমতাবস্থায় পায়ের আক্রান্ত অংশ কেটে বাদ দেয়া ছাড়া বিকল্প কোন উপায় থাকে না। ভয়াবহ এই পরিণতি থেকে বাঁচতে হলে প্রত্যেক ডায়াবেটিক রোগীকে সচেতন এবং সতর্ক হতে
 হবে।
 

পায়ের তালুর চাপ নির্ণয়ের নানারকমের পদ্ধতি প্রচলিত আছে। কিছু পদ্ধতি স্থির দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থার চাপ নির্দেশ করে। আবার কিছু পদ্ধতি হাঁটার সময়ের চাপ নির্দেশ করে। স্থির দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় শরীরের ওজন মোটামুটি সমানভাবে পায়ের তালুর বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু হাঁটার সময় পায়ের তালুর কোন একটি স্থানে খুব অল্প সময়ের জন্য সম্পূর্ণ শরীরের ওজন পড়ে। সুতরাং স্থির অবস্থার চেয়ে চলন্ত অবস্থায় পায়ের তালুর চাপ পরীক্ষা করা জরুরী। এক্ষত্রে পায়ের তালুর চাপ পরীক্ষা করার জন্য বিশ্বের মাত্র কয়েকটি কোম্পানী যন্ত্র তৈরী করে, আর তার দামও অনেক বেশী - প্রায় চল্লিশ লক্ষ টাকার মত।

 


 
নিজ দেশে সহজে প্রাপ্ত জিনিস পত্র দিয়ে অতি অল্প খরচে ডায়নামিক পেডোগ্রাফ নামে একটি যন্ত্র সম্প্রতি বানাতে সক্ষম হয়েছেন আমাদের দেশের সফল বিজ্ঞানী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিকেল ফিজিক্স এন্ড টেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ও চেয়ারপার্সন, ডঃ খোন্দকার সিদ্দিক-ই-রব্বানীর নেতৃত্ত্বে একটি দল। দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরী এ যন্ত্রটির প্রধান সংবেদনশীল অংশটি মাত্র তিন লক্ষ টাকায় সরবরাহ করা হচ্ছে। 

  

 

 
সম্প্রতি ফার্মফ্রেশ নামে আকিজ গ্রুপের একটি ব্র্যান্ড এর অর্থায়নে ঢাকার ওয়ারীতে অবস্থিত ইব্রাহিম ডায়াবেটিক ফুটকেয়ার হাসপাতালে একটি ডায়নামিক পেডোগ্রাফ স্থাপন করা হয়েছে। স্বল্প খরচে নিয়মিত ডায়নামিক পেডোগ্রাফ যন্ত্রের সাহায্যে পায়ের তালুর চাপ পরীক্ষা করার পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে আজীবন ভাল থাকা উচিৎ। 

  

 

উদ্ভাবনের পেছনের কাহিনী

২০০৯ সালের গোড়ার দিকে ঢাকার বারডেম আয়োজিত একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের প্লেনারী সেশনে অধ্যাপক রব্বানী তাঁর দুটি উদ্ভাবন Distribution of F-Latency (DFL) এবং Focus Impedance Method (FIM) কিভাবে ডায়াবেটিক রোগীদের উপকারে আসতে পারে সে বিষয়ে বক্তব্য রাখেন। পাশাপাশি তার উদ্ভাবিত স্বল্প খরচের বিভিন্ন যন্ত্রপাতির বর্ণনাও সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরেন। বক্তৃতা শেষে পাকিস্তান থেকে আসা ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আব্দুল বাসিত বিশেষ আগ্রহ নিয়ে অধ্যাপক রব্বানীর সঙ্গে আলাপ করে ডায়াবেটিক রোগীদের পায়ের প্রদাহ এবং এর ভয়াবহতা তুলে ধরেন। অধ্যাপক আব্দুল বাসিত হচ্ছেন করাচীর Baqai Institute of Diabetology & Endocrinology (BIDE), Baqai Medical University – এর পরিচালক। তিনি অধ্যাপক রব্বানীকে এই রোগ নিরূপণের একটি যন্ত্র স্বল্প খরচে তৈরীর গুরুত্ব বোঝানোর চেষ্টা করেন। বিশ্ব বাজারে বিদ্যমান অত্যন্ত ব্যয়ব্যহুল যন্ত্রটির সম্পর্কেও তিনি তাকে জানান। 

আশির দশকে যুক্তরাজ্যে ভিন্ন একটি প্রযুক্তিতে একই কাজ করার একটি যন্ত্র উন্নয়নের গবেষণা দেখেছিলেন অধ্যাপক রব্বানী, যেটি বাণিজ্যিকভাবে কখনও তৈরী করা হয় নি। এ প্রযুক্তিটি অনুসরণ করে সহজে পাওয়া যায় এমন জিনিস দিয়ে একটু ভিন্ন আঙ্গিকে তৈরী করলে স্বল্প খরচে করা যাবে চিন্তা করে অধ্যাপক রব্বানী গবেষণামূলক ভাবে কাজটি হাতে নিতে রাজী হন। প্রাথমিকভাবে গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন অধ্যাপক বাসিত, এবং পাকিস্তানে ফিরেই তিনি সে অর্থ আগাম পাঠিয়ে দেন। 
এ যন্ত্রটির জন্য হার্ডওয়্যার ও কম্পিউটার সফটওয়্যার – দু ধরণের প্রযুক্তিরই প্রয়োজন ছিল। এ জন্য অধ্যাপক রব্বানী কয়েকজনকে নিয়ে একটি দল গড়ে তোলেন। এক বছরেরও কম সময়ে তারা সম্পূর্ণ প্রযুক্তিটি শেষ করেন। প্রয়োজনীয় রপ্তানী পারমিট সংগ্রহ করে অধ্যাপক রব্বানী নিজে যন্ত্রটির মূল সংবেদনশীল অংশটি সাথে করে ২০১০ সালের জানুয়ারীতে করাচী নিয়ে যান ও বাকাই মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে সফলভাবে স্থাপন করেন। সে সময় থেকে সেখানে যন্ত্রটি সন্তোষজনকভাবে রোগীদের নিয়মিত সেবা দিয়ে আসছে। হার্ডওয়্যার তৈরীতে তাকে সহযোগিতা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ওয়ার্কশপের অবসরপ্রাপ্ত ফোরম্যান নারায়ণ চন্দ্র দে এবং তার পুত্র পার্থ দে। সফটওয়্যার তৈরী করেন হ্রাদ মুআসির রব্বানী, জাহিদ ইশরাক ও রিয়াদ। উল্লেখ্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে কম্পিউটার বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর হ্রাদ অধ্যাপক রব্বানীরই পুত্র। 
পাকিস্তানে এ যন্ত্রটির সফলতার কথা ঢাকার ডায়াবেটিক সমিতির ঊর্ধতন কর্মকর্তাগণও জানতে পারেন এবং এ ধরণের একটি যন্ত্র নেয়ার চিন্তাভাবনা শুরু করেন। পাশাপাশি অধ্যাপক রব্বানী আকিজ গ্রুপের একজন পরিচালক, জনাব শেখ জামিলউদ্দীনের সাথে আলাপ করেন। তিনি এজন্য সম্পূর্ণ অর্থায়ণ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় কয়েক মাস আগে ঢাকার ওয়ারীতে অবস্থিত ইব্রাহিম ডায়াবেটিক ফুটকেয়ার হাসপাতালের ডায়নামিক পেডোগ্রাফ যন্ত্রটি স্থাপিত হয়।


পেডোগ্রাফ যন্ত্রটির কার্যকরণ

আলোক পদার্থবিজ্ঞানের সাধারন প্রতিফলন তত্ত্বকে ব্যবহার করে তৈরী করা হয়েছে এই যন্ত্রটি। প্রয়োজনীয় উপাদানের মধ্যে রয়েছে একটি ফ্লোরোসেন্ট আলোর ল্যাম্প বা অনেকগুলো LED সম্বলিত একটি স্ট্রিপ লাইট, স্বচ্ছ প্লাস্টিক বা কাঁচের মোটা একটি পাটাতন, সাদা কাগজ, কালো প্লাস্টিকের আঠা লাগানো শীট, ভিডিও ক্যামেরা এবং কাঠের বাক্স। চিত্র – ১ এর মতো করে উপাদানগুলো সংযোজন করার পর আমরা পেতে পারি আকাংক্ষিত পেডোগ্রাফটির সংবেদনশীল অংশ।


 
উপরে সাদা কাগজ বসানো প্লাস্টিক বা কাঁচের পাটাতনটি হচ্ছে পেডোগ্রাফের প্রধান সংবেদনশীল অংশ। এর ভিতরে ঢোকা আলোক রশ্মিগুলো পূর্ণ আভ্যন্তরীণ প্রতিফলনের কারণে পাটাতনের ভেতরেই থেকে যায়। এর বাইরে উপরে ও নীচে আলোক রশ্মিগুলোর কোন প্রতিফলন বা প্রতিসরণ হয় না। যার ফলে টুকরোটির নিচে রাখা ভিডিও ক্যামেরাতে ধারনকৃত ইমেজ অন্ধকার বা ডার্ক হয় (চিত্র – ২)।


যখন উপরে সাদা কাগজের উপর পায়ের চাপ পড়ে তখন কাগজ ও কাঁচের পাটাতনের মধ্যে থাকা বাতাসের অণুগুলো সরে গিয়ে কাগজটি পাটাতনের সাথে সেঁটে যায়। এর ফলে সেখানে পূর্ণ আভ্যন্তরীণ প্রতিফলন আর থাকে না, এবং আলোক রশ্মিগুলো উপর দিকে প্রতিসরিত হয়ে কাগজের উপর পড়ে  (চিত্র – ৩)। তখন কাগজের সে অংশটি থেকে আলোকরশ্মি বিচ্ছুরিত হয়ে নিচের ভিডিও ক্যামেরাতে সাদা ইমেজ আকারে ধরা পড়ে। চাপের পরিমাণ বাড়লে ইমেজের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি পায়। আবার চাপের পরিমাণ কমলে ইমেজের উজ্জ্বলতা হ্রাস পায়। সুতরাং ইমেজের উজ্জ্বলতার ভিন্নতা থেকে চাপের পরিমাণের একটি ধারণা পাওয়া যায়। সহজে বোঝাবার জন্য সফটওয়ারের মাধ্যমে একটি কৃত্তিম রঙের ইমেজ তৈরী করা হয়। অধ্যাপক রব্বানীর দলের তৈরী যন্ত্রে এ জন্য পছন্দ করা হয়েছে ছাই, হাল্কা নীল, গাড় নীল, হলুদ, সবুজ, কমলা ও লাল। ছাই রং সবচেয়ে কম চাপ এবং লাল রং সবচেয়ে বেশী চাপ নির্দেশ করে।


পর্যবেক্ষণের উদ্দেশ্যে যখন কোন রোগী পেডোগ্রাফের প্রধান সংবাদনশীল অংশের উপর দিয়ে হেঁটে যায়, তখন ব্যক্তির পায়ের চাপের ছবি প্রথমতঃ ভিডিও ক্যামেরার মাধ্যমে একটি সাদা-ছাই-কালো ইমেজ ফাইল আকারে সংযুক্ত কম্পিউটারে সংরক্ষণ করা হয়। পরে সফটওয়ারের মাধ্যমে ইমেজের প্রতিটি বিন্দুর উজ্জলতার বিশ্লেষণ করে যথাযথভাবে উপরের মত পছন্দ করা রঙগুলোতে পরিবর্তন করে নতুন একটি ইমেজ ফাইল তৈরী করা হয়, যেটি চালালে নতুন কৃত্তিম রঙে পায়ের চাপের চলচ্চিত্র দেখা যায়। আবার সব ছবি একত্র করে একটি কম্পোজিট ছবিও তৈরী করা হয়। তখন যে সব অঞ্চলে চাপ বেশী দেখা যায় সে রকম ছয়টি অঞ্চল বাছাই করে কম্পিউটার অপারেটর বৃত্ত এঁকে দেন, গ্রাফের মাধ্যমে সে ছয়টি অঞ্চলের ডায়নামিক চাপের পরিবর্তন তুলে ধরা হয়। ছবিগুলোতে কমলা বা লাল রঙগুলো উচ্চ চাপের অঞ্চল নির্দেশ করে, এবং তখন রোগীকে এ বিষয়ে সচেতন করে দেয়ার প্রশ্ন আসে। তৈরী যন্ত্রে একসাথে তিন সেকেন্ড – এর ভিডিও চিত্র বিশ্লেষণ করা যায়, যেখানে ৯০ টি স্থির চিত্র থাকে। হাঁটার সময় একজন স্বাভাবিক মানুষের এবং একজন রোগাক্রান্ত ব্যক্তির পায়ের চাপের কয়েকটি ক্রমধারা চিত্র ৪ ও ৫ এ দেখানো হয়েছে, ও চিত্র ৬ এ পায়ের কম্পোজিট ছবিসহ ছয়টি গ্রাফ দেখানো হয়েছে।


ডায়নামিক পেডোগ্রাফটির প্রায়োগিক এবং যথোপযুক্ত ব্যবহার তখনই সফলতা লাভ করবে যখন এর উপাত্ত পর্যালোচনা করে সে অনুযায়ী রোগীকে জুতো তৈরী করে দেয়া যাবে। এজন্য বেশী চাপের স্থানে জুতোর শুকতালুতে প্রয়োজনমত গর্ত করে দিলে পায়ের চাপ ছড়িয়ে যাবে, একস্থানে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর ফলে রোগীর পায়ে আলসার বা ঘা হওয়ার সম্ভাবনা অনেক কমে যাবে। 


দেশে তৈরী ডায়নামিক পেডোগ্রাফটি এখন বাণিজ্যিকভাবে প্রস্তুত করে দেয়ার জন্য ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এ ছাড়াও নিজেদের তৈরী অন্যন্য চিকিৎসা যন্ত্রপাতি মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার জন্য বাই-বিট লিঃ নামে একটি অংশীদারবিহীন কোম্পানী তৈরী করা হয়েছে যেখানে কোন উদ্যোক্তা লাভের অংশ নিতে পারবেন না। অধ্যাপক রব্বানীর নেতৃত্বে স্থাপিত জনকল্যাণমূলক এ কোম্পানীর মাধ্যমে সাধারণ জনগণ স্বল্পমূল্যে আধুনিক চিকিৎসাযন্ত্রের সেবা পাবে এ আশাবাদ রইল।  
 
 
 
স্যার আর উনার গ্রুপের কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে   ভিজিট করুন http://www.du.ac.bd/department/common/home.php?bodyid=BIOPHY
এডিটরনোট:    0

প্রকাশিত সব তথ্য আর মতামত লেখকের আর মন্তব্য কারীর ব্যক্তিগত, সাইয়েন্টিফিক বাংলাদেশের নয়। সাইয়েন্টিফিক বাংলাদেশ আইনগত বা অন্য কোন দায় গ্রহণ করবে না তথ্যের সঠিকতা বা পাঠকের মন্তব্যের জন্য।

Rate it :12345
Tell a Friend

Sorowar Hossain

 
Loading... Please wait...