wholesale jerseys
wholesale jerseys
and real Jerseys Wholesale

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা : কেমন হলে ভালো হয়-৩

2017-11-22 17:07:14

ছবিঃ ইন্টারনেট থেকে সংগৃহিত

শিক্ষার বর্তমান অবস্থা

প্রি-প্রাইমারি শিক্ষা

আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি মারাত্মক ক্ষতিকর দিক হলো, কিছু কিছু স্কুল কর্তৃক শুধুমাত্র পয়সার লোভে প্রি-প্রাইমারি অর্থাৎ প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার উপর মাত্রাতিরিক্ত গুরুত্ব আরোপ করে আসছে। এসব স্কুলে প্লে-গ্রুপ, নার্সারি, কেজি ওয়ান, কেজি টু ইত্যাদি নামে দুই থেকে চারটি পর্যন্ত প্রি-প্রাইমারি ক্লাস চালু করে খুবই ছোটো ছোটো শিশুদের জীবন ধ্বংস করে চলছে। এসব ক্লাসের কচি বাচ্চাদের উপর প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা ক্লাসের পড়া তৈরি ও পরীক্ষার প্রস্তুতির নামে মায়েরা এবং প্রাইভেট টিউটররা নির্মম মানসিক অত্যাচার করে চলছেন। আগের দিনে বাচ্চারা পাঁচ-ছয় বছর বয়সে স্কুলে গিয়ে ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হতো।(আমার নিজের তিন ছেলেমেয়ের কাউকে আমি পাঁচ বছর বয়স হবার আগে কোনো স্কুল পাঠাইনি। সেজন্য আমার কোনো অনুতাপও নেই।) কোনোকোনো স্কুলে বড় জোর বেবি ক্লাস বা শিশুশ্রেণী নামে শুধু একটি প্রি-প্রাইমারি ক্লাস ছিলো। সেখানেও পাঁচ বছর বয়সের আগে শিশুরা ভর্তি হতো না। কয়েক বছর আগে মার্কিন যুক্তরাস্ট্রে একাধিক প্রি-প্রাইমারি ক্লাস খোলার হুজুগ সৃষ্টি হয়। অনেকে মনে করেন, এর পেছনে কোনো বৈজ্ঞানিক যুক্তি নেই। পশ্চিমা দেশগুলিতে মায়েরা সবাই কর্মজীবি। তাদেরকে ম্যাটারনিটি লিভ শেষ হলেই বাচ্চাকে ডে-কেয়ার সেন্টারে জমা রেখে কাজে যেতে হয়। গন্ডগোলের শুরু এখান থেকেই। সস্তা জনপ্রিয়তা লাভের আশায় কিছু অতি উৎসাহী ডে-কেয়ার সেন্টার বাচ্চাদের বয়স আড়াই-তিন বছর না হতেই নানা নামে নানা বাহানায় তাদের উপর লেখাপড়ার বোঝা চাপিয়ে দিতে শুরু করে। এ বয়সের শিশুদের একটা বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এরা শেখে যেমন তাড়াতাড়ি, আবার ভুলে যায়ও তেমন তাড়াতাড়ি। এটাকে তাই সত্যিকার অর্থে লার্নিং বা শেখা বলা যায় না। তবুও অতি উৎসাহী প্রতিষ্ঠান শিক্ষণীয় বিষয়ের সংখ্যা এবং সেগুলোর পাঠ্যসূচি বাড়িয়ে দিয়ে শিশুদের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলছে। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, একটি মানবশিশুর মেন্টাল ফ্যাকাল্টি, অর্থাৎ কোনো কিছু করার মানসিক ক্ষমতা, জন্মের পর থেকে অত্যন্ত ক্ষীণভাবে কার্যকর হতে শুরু করলেও তা আসলে লক্ষ্যনীয় হয় দু’বছর বয়স থেকে। দু’বছর বয়স হলে একটি শিশু “ডু’জ এন্ড ডোন্ট’জ”, করণীয় ও বর্জনীয় সম্বন্ধে সচেতন হতে শুরু করে। এই সচেতনতা একটা সামাজিক রূপ পরিগ্রহ করে প্রায় পাঁচ বছর বয়সে, তার আগে নয়। এই সময়ের আগে একটি বাচ্চাকে কোনো প্রকার মানসিক বা শারীরিক চাপের মধ্যে ফেলা উচিৎ নয়। তাকে স্বাধীনভাবে নিজেরমতো করে বেড়ে উঠার সম্পূর্ণ সুযেোগ দিতে হবে। বেড়ে উঠার এই সময়টাতে বাইরে থেকে যতো কম হস্তক্ষেপ করা যায় বাচ্চার জন্য ততই মঙ্গলজনক। এই বয়সের একটি বাচ্চা নিজ থেকে অনেক প্রশ্ন করবে, অনেক কিছু জানতে চাইবে। স্বাভাবিকভাবে নিজ থেকে বাচ্চা যেসব প্রশ্ন করবে সহজবোধ্য ভাষায় তার জবাব দিয়ে বাচ্চার কৌতুহল নিবৃত্ত করতে হবে। তাতে তার মধ্যে আরও নতুন কৌতুহল গড়ে উঠবে, জানার আগ্রহ বাড়তে থাকবে। শিশুকে কখনও প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে নিরুৎসাহিত করা যাবে না। এই বয়স অতিক্রম করার আগেই যদি তাকে রুটিনবদ্ধ লেখাপড়া দিয়ে ভারাক্রান্ত করা হয়, পরীক্ষায় প্রথম হবার জন্য তার উপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হয়, তবে তা বাচ্চাটির সমূহ ক্ষতির কারণ হতে পারে। লেখাপড়া সম্পর্কে তার মনে এমন আতংক সৃষ্টি হতে পারে, যা সারা জীবন তাকে লেখাপড়া থেকে দূরে থাকতে প্ররোচিত করতে পারে। বাগানের একটি গোলাপের কলিকে যদি প্রাকৃতিকভাবে স্বাভাবিক গতিতে বাড়তে না দিয়ে প্রতিদিন তার পাপড়ি ধরে কেউ টানতে থাকে তাহলে সে কলিটি তার সহজাত রূপ আর সুগন্ধি নিয়ে একটি পরিপূর্ণ গোলাপরূপে আত্মপ্রকাশ করতে পারে না। সাম্প্রতিক কালে পশ্চিমা দেশগুলোতে বাচ্চাদের মধ্যে লেখাপড়ার প্রতি, বিশেষ করে উচ্চ শিক্ষার প্রতি, যে চরম অনাগ্রহ প্রকাশ পাচ্ছে তার জন্য অনেকেই সেসব দেশে প্রচলিত প্রি-প্রাইমারি শিক্ষার অসহনীয় যন্ত্রনাকে দায়ী করছেন। তাই আজ সেসব দেশে প্রি-প্রাইমারি শিক্ষা বন্ধ করে দেওয়ার কথা উঠেছে। এদের মধ্যে অনেক দেশ শিশুদেরকে এ যন্ত্রনা থেকে মুক্ত রাখার জন্য প্রাথমিক পর্যায়ে বার্ষিক পরীক্ষা পদ্ধতি বিলোপ করেছে। বছর শেষে বাচ্চারা এমনিতেই উপরের ক্লাসে প্রমোশন পেয়ে থাকে।



এখানে আমার একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলা, আশা করি, অপ্রাসঙ্গিক হবে না। আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ের কথা। আমি তখন ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের শহীদ বীর উত্তম লে: আনোয়ার বালিকা বিদ্যালয়ের (তখনও কলেজ হয়নি) দেখাশুনার দায়িত্বে ছিলাম। স্কুলটিতে তখন শুধু একটি প্রি-প্রাইমারি ক্লাস ছিলো। কমবেশি পাঁচ বছর বয়সের বাচ্চাদের সে ক্লাসে ভর্তি করা হতো। অনেকেই জানেন, ভর্তির ব্যাপারে স্কুলটি সেনাবাহিনীর সদস্যদের বাচ্চাদের অগ্রাধিকার দিযে থাকে। বেশ কিছু তরুণ আর্মি অফিসার (যার মধ্যে কেউকেউ ক্যাডেট কলেজে ও মিলিটারি একাডেমিতে আমার ছাত্র ছিলো।) আমার উপর চাপ সৃষ্টি করলো, কেজি ক্লাসের নিচে নার্সারি নামে আরও একটি ক্লাস যোগ করতে। যে ক্লাসে তিন থেকে সাড়ে তিন বছরের শিশুদের ভর্তি করা হবে। উপরে বর্ণিত বক্তব্যের আলোকে আমি তাদেরকে বুঝাতে চেষ্টা করলাম যে, কাজটা ঠিক হবে না, বিজ্ঞানসম্মত হবে না। এতে পরিনামে তোমাদের বাচ্চাদের ক্ষতি হবে। তোমাদের বাচ্চারা এখনও “ডু’জ এন্ড ডোন্ট’জ” সম্বন্ধে সচেতন হয়ে উঠেনি। নানা ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আগত সহপাঠী, এমনকি প্রশিক্ষণহীন শিক্ষক বা কর্মরত পিয়ন-আয়াদের কাছ থেকে, (অশালীনসহ) এমন সব কথা বা কাজ শিখতে পারে যা তোমরা কোনোদিন চিন্তাও করোনি। একটি ছেলে বা মেয়ে কতো বছর বয়সে এসএসসি পাশ করেছে সে তথ্যের তেমন কোনো গুরুত্ব নেই। দেশে বা বিদেশে সে কথা কেউ কোনোদিন জানতে চায় না। যে কথা সারা জীবন মানুষ জানতে চায়, এমনকি বিয়ে দেওয়ার সময়ও, তা হলো ছেলেটি বা মেয়েটি কোন ডিভিশনে (বর্তমানে কতো জিপিএ নিয়ে) পাশ করেছিলো। আমাদের শিক্ষা পদ্ধতিতে তার ভবিষ্যত শিক্ষাজীবন নির্ভর করে এই রেজাল্টের উপর। চৌদ্দ বছর বয়সে পরীক্ষা দিয়ে এসএসসিতে দ্বিতীয় বিভাগ পাওয়া ভালো, না ষোলো বছর বয়সে স্টার মার্কস পেয়ে পাশ করা ভালো ? আমি তাদেরকে এ-ও বললাম, স্কুলে ভর্তি হবার আগে একজন অল্প শিক্ষিত মা-ও বাসায় বসে প্রি-প্রাইমারির পড়া পড়াতে পারেন। প্রত্যেক মা, প্রশিক্ষণ ছাড়া অন্যের সন্তানকে পড়াতে না পারলেও, তার নিজের সন্তানের জন্য ন্যাচারাল টিচার। আমরা যারযার নিজের মায়ের কথা মনে করলে একথার সত্যতা বুঝতে পারবো। আমার কথা অফিসারদের মানাতে পারলেও তাদের স্ত্রীদের কোনোমতেই বুঝানো গেলো না। নার্সারি ক্লাস খুলতেই হলো। স্কুলটির তখনকার অধ্যক্ষ ছিলেন একজন মহিলা। তিনি রসিকতা করে বললেন, স্যার, আপনার কথা অফিসারদের স্ত্রীরা কেনো বুঝলেন না, তা বুঝতে পারলেন? আমি উত্তরে না বলাতে তিনি বললেন, আর্মি অফিসারদের স্ত্রীদের সারা জীবনের একটি দু:খ হলো, তাঁরা অন্য ডিপার্টমেন্টের অফিসারদের স্ত্রীদের মতো সকাল বেলা প্রাণভরে ঘুমাতে পারেন না! সপ্তাহে ছয় দিন তাঁদের খুব ভোরে উঠে স্বামীর জন্য নাস্তা বানাতে হয়, কাপড়-চোপড় এগিয়ে দিয়ে স্বামীকে অফিসের জন্য তৈরী হতে সাহায্য করতে হয়। স্বামী অফিসে চলে গেলে দুপুর দু’টা-আড়াইটার আগে বাসায় ফেরেন না। তাই সকালে স্বামী বাসা ছাড়ার সাথে সাথে তাঁরা ঘন্টা তিন-চারেক একটানা ঘুমিয়ে হারানো ঘুম পুষিয়ে নিতে চান। তখন, যাদের তিন-চার বছর বয়সের বাচ্চা ঘরে আছে সেসব মায়েরা বাচ্চা বাসায় থাকলে নিজেরা একটু আরাম করে ঘুমাতে পারেন না। তাই তাঁরা বাচ্চা স্কুলে পাঠিয়ে অন্তত: তিন-চার ঘন্টা ঝামেলামুক্ত থাকতে চান। নিজে মহিলা হয়ে হয়ত অন্য মহিলার কষ্টের বিষয়টি তিনি সহজে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন!



আমাদের দেশে শহর ছাড়িয়ে গ্রামেও এখন বেসরকারি প্রি-প্রাইমারি শিক্ষার জোয়ার এসেছে। নানা প্রকার ইংলিশ ও বাংলা মিডিয়ামের নার্সারি, প্রি-ক্যাডেট স্কুল, চাইল্ড কেয়ার হোম, কেজি স্কুল ইত্যাদি ব্যাঙ্গের ছাতার মতো যেখানে-সেখানে গজিয়ে উঠেছে এবং উঠছে। এসব স্কুলের ফি-ও নিতান্ত কম নয়। দেখার কেউ নেই বলে ঢাকার স্কুলগুলো অত্যন্ত অযৌক্তিকভাবে আকাশচুম্বী ফি আদায় করছে। এসব স্কুলে বাচ্চা পাঠিয়ে আমরা আমাদের শিশুদের শিক্ষা জীবনকে শুরু হবার আগেই ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছি। পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় আমাদের দেশের অবস্থা অনেক বেশি মারাত্মক। সেসব দেশে একমাত্র বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞরা শিক্ষক হিসেবে এসব ছোটোছোটো শিশুদের লেখাপড়া শেখাবার দায়িত্ব নেন। সেসব দেশে কাজের জন্য জবাবদিহিতাও কঠোরভাবে কার্যকর করা হয়। অন্যদিকে আমাদের দেশে এসব স্কুলে তিন থেকে পাঁচ বছরের শিশুদের লেখাপড়া শেখাবার দায়িত্ব আমরা কাদের হাতে ন্যস্ত করেছি? যাদের উপর আমরা নিশ্চিন্তে এই গুরুদায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছি তারা বেশিরভাগ হলো, এসএসসি/এইচএসসি পরীক্ষায় সেকেন্ড বা থার্ড ডিভিশন পাওয়া বা ফেল করা যুবক-যুবতী। এরা অন্য কোথাও কাজ-কর্ম না পেয়ে একাজ করতে আসে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এরা স্কুলের মালিকের নিজের বা তার বন্ধুর বেকার আত্মীয়। এসব তরূণ-তরুণীদের শিশু মনস্তত্ব বিষয়ে কোনো পড়াশুনা বা বাস্তব অভিজ্ঞতা নেই। অতি অল্প বেতনের বিনিময়ে এদের নিয়োগ করা হয়। একটি বহুতল ভবনের ভিত্তি স্থাপনের জন্য আনাড়ি ওস্তাগর নিয়োগ করা যেমন মারাত্মক অপরাধ, প্রতিশ্রুতিশীল শিশুদের শিক্ষার ভিত্তি নির্মাণের জন্য আনাড়ি শিক্ষক নিয়োগ করা তার চাইতে অনেক বেশিগুণ বড় অপরাধ। দালান ত্রুটিযুক্ত হলে তা ভেঙ্গে পুনর্নির্মাণ করা যায়। কিন্তু ত্রুটিযুক্ত দেহ-মন-আত্মা নিয়ে বেড়ে উঠা শিশুকে সংশোধণ করা মোটেও সহজ নয়। এই আত্মঘাতী ব্যবস্থার ফল আমাদের সমাজ ইতোমধ্যে পেতে শুরু করেছে। শিক্ষিত ও অবস্থাপন্ন পরিবার থেকে আজকাল অনেক শিক্ষাবিমুখ মস্তান, মাদকাসক্ত ও সন্ত্রাসী পয়দা হচ্ছে। খোঁজ নিলে দেখা যাবে, তারা অনেকেই শিশু বয়সে দায়িত্বজ্ঞানহীন মা-বাবা এবং আনাড়ি শিক্ষকের পাল্লায় পড়ে এমনটা হয়েছে।

 

সরকারি প্রাইমারি স্কুল

শিক্ষকের গুণগত মানের কথা বিবেচনা করলে সরকারি প্রাইমারি স্কুলগুলোর অবস্থা ভিন্নতর কিছু নয়। কাগজে-কলমে রেজাল্ট যা-ই হোক না কেনো, অত্যন্ত নিম্ন মানের শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন লোকেরা এসব স্কুলে মাস্টারি করছেন। চাকুরিতে ঢোকার পরপর পিটিআই নামের আট-দশ মাসের একটি প্রশিক্ষণ এদেরকে দেওয়া হয়ে থাকে। পিটিআই-এর সিলেবাসটা খারাপ নয়। কিন্তু সমস্যা অন্যখানে। এসব ইন্সটিটিউটের যাঁরা শিক্ষক তাঁরা সিলেবাসের গুরুত্ব উপলব্ধি করেন না, ঠিকমতো পড়ান না। সবচাইত বড় অভিযোগ, এদের অধিকাংশ ভীষণ দুর্নীতিপরায়ণ। ছাত্রদের কাছ থেকে উৎকোচ নিয়ে পাশ করিয়ে দেন। অত্যন্ত দুর্বল শিক্ষাগত যোগ্যতা সত্ত্বেও ছা্ত্ররা যদিওবা এই কোর্স থেকে কিছুটা পেশাগত জ্ঞান অর্জন করতে পারতো, দুর্নীতিপরায়ণ শিক্ষক ও দুর্বল প্রশাসনের জন্য তা সম্ভব হচ্ছে না। সরকারি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকদের বর্তমানে, কাগজে-কলমে যা-ই লেখা থাক না কেনো, বাস্তবে কোনো জবাবদিহিতার ব্যবস্থা নেই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে উৎকোচ দিয়ে উপজেলা পর্যায়ের শিক্ষা অফিসারকে তুষ্ট রাখতে পারলে অন্য কারও পরোয়া তাঁদেরকে করতে হয় না। যথেষ্ট সদিচ্ছা নিয়ে ১৯৭৩ সনে  সরকার প্রাইমারি শিক্ষকদের চাকুরিকে সরকারি চাকুরি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে এক মস্তবড় ভুল করেছিলেন কিনা, সে প্রশ্ন অনেকেই করে আসছেন। এর আগে, সেই বৃটিশ আমল থেকে, প্রাইমারি স্কুলগলেো পরিচালনা করার দায়িত্ব ছিলো স্থানীয় সরকারের। স্থানীয় সরকার এবং সেই সাথে স্থানীয় কমিউনিটি লিডাররা স্কুলগুলো ঠিকমতো চলছে কিনা, মাস্টাররা ঠিকমতো পড়াচ্ছেন কিনা, তা সুপারভাইজ করতে পারতেন, এবং তা করতেনও। কেননা তাঁদের নিজেদের বাচ্চারা এসব স্কুলে পড়তো বলে এতে তাঁদের ব্যক্তিগত স্বার্থ নিহীত ছিলো। পাক্কা সরকারি কর্মকর্তা হবার সুবাদে এখনকার প্রাইমারি স্কুলের মাস্টারদের অন্যন্য সরকারি কর্মকর্তাদের মতো আর স্থানীয় কারও কাছে জবাবদিহি করতে হয় না। স্থানীয় জনসাধারণ, যাদের বাচ্চারা এসব স্কুলে বাধ্য হয়ে পড়ছে, এসব মাস্টারদের স্বেচ্ছাচারিতার সামনে বড় অসহায় বোধ করছে। পারতপক্ষে কোনো বাবা-মা সরকারি প্রাইমারি স্কুলে বাচ্চা পাঠাতে চান না, যদিও সেখানে বিনা পয়সায় পড়ানো হয়ে থাকে। যাঁরা পাঠাচ্ছেন, তাঁদের কোনো বিকল্প নেই, বা বিকল্প থাকলেও খরচ কুলাতে পারেন না, বলে পাঠাচ্ছেন। রাস্ট্রীয় পর্যায়ে এটা কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা হতে পারে না।

 

সরকারি/বেসরকারি মাধ্যমিক স্কুল ও কলেজ

মাধ্যমিক স্কুলের অবস্থা আলাদা করে বর্ণনা করার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। দু’য়েকটি সম্মানজনক ব্যতিক্রম বাদে, শিক্ষক এবং প্রদত্ত শিক্ষার মান বিচার করলে, এগুলোর অবস্থাও উপরে বর্ণিত সরকারি প্রাইমারি স্কুলের মতো। সত্যিকার অর্থে আজকাল শতকরা একশ’ ভাগ বেসরকারি হাই স্কুল বলতে আর কোনো স্কুল নেই। এসব স্কুলের শিক্ষকরা তাঁদের বেতনের ৯০% এখন সরকার থেকে পেয়ে থাকেন। যেভাবে সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে তাতে মনে হয় এটা অচিরে ১০০% হয়ে যাবে। (হয়তো এতোদিনে হয়েও গেছে।) হয়ে গেলে তাতে দোষের কিছু নেই। কিন্তু সমস্যা অন্যখানে। বেসরকারি স্কুলগুলোর দেখাশুনার জন্য স্থানীয় ব্যক্তিদের সমন্বয়ে ম্যানেজিং কমিটি থাকলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, স্থানীয় রাজনীতি ও পদ্ধতিগত ত্রুটির জন্য এসব কমিটি ইচ্ছে থাকলেও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে না। সরকারি মাধ্যমিক স্কুলগলোর উপর সরকারের সংশ্লিষ্ট ডিপার্টমেন্টের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকলেও দুর্নীতি ও পদ্ধতিগত ত্রুটির জন্য এগুলোর মান ক্রমেই নিম্নগামী। সরকারি ও বেসরকারি স্কুল ও কলেজগুলো সম্পর্কে একই মন্তব্য প্রযোজ্য। স্কুল কলেজগুলোর শ্রেণীকক্ষে পড়ানো হয় না। খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের মতো কোনো শিক্ষাসহায়ক কার্যক্রম (কো-কারিকুলার এক্টিভিটিজ), যার মাধ্যমে ছাত্ররা চারত্রিক গুণাবলী (ক্যারেক্টার ট্রেইটস), ব্যক্তিত্ত্ব সংক্রান্ত গুণাবলী (পার্সোনালিটি ট্রেইটস) এবং নেতৃত্বের গুণাবলি অর্জন করতে পারে, তার কিছুই বলতে গেলে চর্চা করা  হয় না। এসব কার্যক্রম চালাতে হলে শিক্ষকদের শ্রেণীকক্ষের বাইরে ছাত্রদেরকে অনেকটা সময় দিতে হয়। তাঁদের তো সে সময় নেই। প্রা্য় সবাই ব্যস্ত থাকেন কখন ক্লাসে পড়ানো শেষ করে বাড়ি গিয়ে দোকানের, অর্থাৎ প্রাইভেট টিউশনির দোকানের, ঝাঁপি খুলবেন। প্রাইভেট পড়িয়ে অতিরিক্ত আয়ের লোভ এদের প্রায় সবাইকে নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্বন্ধে একেবারে অন্ধ করে ফেলেছে। এমতবস্থায় কিছু বিত্তবান সচেতন অভিভাবক তাঁদের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার জন্য পার্শ্ববর্তী দেশের স্কুলগুলিতে পাঠাচ্ছেন। এমন ছেলেমেয়ের সঠিক সংখ্যা কতো তার হিসাব না থাকলেও অনেকে মনে করেন সেকেন্ডারি লেভেল পর্যন্ত এ সংখ্যা পঞ্চাশ হাজরের কম হবে না।

 

ভালো স্কুল ও মন্দ স্কুল

দেশের প্রতিটি অঞ্চলে, আঙ্গুলের ডগায় গোনা যায় এমন, গুটিকয়েক মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল ভালো স্কুল হিসেবে স্বীকৃত হয়ে আসছে। প্রতি বছর ভর্তির মৌসমে এসব স্কুলে প্রচন্ড ভিড় হয়। ঢাকায় এ ধরনের কোনো কোনো স্কুলে ভিড় নিয়ন্ত্রণের জন্য এমনকি পুলিশের সাহায্য নিতে দেখা যায়। প্রশ্ন উঠা স্বভাবিক, সরকারি এবং সরকার কর্তৃক অনুমোদিত সব স্কুলে ন্যূনতম ভৌত অবকাঠামো ও যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকমন্ডলি রয়েছেন। তারপরও কেনো কিছু স্কুল “মন্দ স্কুল” হিসেবে বিবেচিত হবে? এর একমাত্র কারণ, এসব স্কুলে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহিতার অভাব রয়েছে। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করা গেলে কোনো স্কুল আর “মন্দ স্কুল” হিসেবে বিবেচিত হবে না। এখানে প্রাসঙ্গিকভাবে একটা কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। স্বাভাবিক অবস্থায় প্রাইমারি থেকে সেকেন্ডারি লেভেল পর্যন্ত একজন শিক্ষার্থী তার নিজের নেইবারহুড বা পাড়ার স্কুলে পড়াশুনা করবে। বিশেষ করে প্রাইমারি স্কুলের একজন শিক্ষার্থী তার মা, বাবা অথবা পরিবারের ঘনিষ্ঠ অন্য কোনো সদস্যের হাত ধরে স্কুলে যাওয়া-আসা করবে। স্কুল বাড়ির কাছে হওয়াতে তাকে স্কুল শুরু হবার এক বা দেড় ঘন্টা আগে বাড়ি থেকে যাত্রা করতে হবে না। একইভাবে ছুটির পর বাড়ি ফেরার জন্য আবার এক বা দেড় ঘন্টা অপেক্ষা করতে হবে না। স্কুলে যাওয়া-আসার জন্য এতো অধিক সময় ব্যয় করলে শিক্ষার্থীর সময়মতো খাওয়া-দাওয়া ও খেলাধুলা করার সময় পায় না। সে স্কুলে যাবার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। এমন অবস্থায় শিক্ষার্থীর মনে সুদূরপ্রসারী বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়। যার লক্ষণ ইতোমধ্যেই আমাদের সমাজে প্রকাশ পেয়েছে।

 

সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়

দেশে বর্তমানে দুই ধরনের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এগুলোর বেশিরভাগ পরিচালিত হয়ে আসছে ১৯৭৩ সনে প্রবর্তিত বিশ্ববিদ্যালয আইন দ্বারা। আমার জানামতে শুধুমাত্র বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৬১ সনে প্রণীত) ভিন্ন আইনের অধীনে পরিচালিত হয়ে আসছে। ১৯৭৩ সনের বিশ্ববিদ্যালয় আইন দ্বারা পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বর্তমান করুন অবস্থা সম্পর্কে বেশি লেখার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। অন্যান্য একাডেমিক অনিয়মের বাইরে দাঙ্গাহাঙ্গামা, গুম-খুন, ছিনতাই-রাহাজানি, অপহরণ, শিক্ষক হত্যা, ছাত্র হত্যা, ধর্ষণসহ সকল প্রকার নারীঘটিত অপরাধ, টেন্ডারবাজি, লুঠসহ এমন কোনো জঘণ্য সামাজিক অপরাধ নেই যা এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে, এবং ক্যাম্পাসের বাইরে ছাত্র-ছাত্রী কর্তৃক সংঘটিত হয়ে আসছে না। অতি সম্প্রতি খবরে প্রকাশ, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ বেশ কিছু সিনিয়র অফিসার দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হয়েছেন। মিডিয়ার বদান্যতার কারণে অনেক খবর বাইরের লোকদের গোচরে আসে না। তবে সচেতন ব্যক্তিমাত্ররই এ বিষয়ে কমবেশি জানা আছে। এমনকি এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক বিবেকসম্পন্ন শিক্ষক বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে চিন্তা-ভাবনা করছেন। বর্তমান আলোচনার খাতিরে সংক্ষেপে শুধু এতোটুকু বলা যায় যে, এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জাতীয় রাজনীতির এপেনডিক্স হিসেবে কাজ করছে। সর্বপ্রকার সন্ত্রাস, এক শ্রেণীর শিক্ষকদের কর্মবিমুখতা, শ্রেণীকক্ষে ছাত্র পড়ানোর চাইতে জাতীয় রাজনীতি, কনসালটেন্সি ও পার্টটাইম কাজে অধিকতর আগ্রহ, সময়মতো পরীক্ষার ফল প্রকাশে ব্যর্থতা, অপরকে কনুই মেরে উপরের পদে উঠা, সকল ক্ষেত্রে মান নিয়ন্ত্রণ ও মান যাঁচাইয়ের অভাব, দুর্নীতি ইত্যাদি সবকিছু মিলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আজ ধ্বংসপ্রায়। সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর অবস্থা একই রকম। প্রফেসরের বুকে পিস্তল ধরে ডাক্তারি ডিগ্রি আদায় করা হচ্ছে। অনেকে এদেরকে এম বি বি এস (পিস্তল) বলে থাকে। উল্লেখ্য যে, মধ্যপ্রচ্যের গুটিকয়েক মুসলিম দেশ ছাড়া পৃথিবীর আর কেউ আমাদের দেশের মেডিকেল ডিগ্রিকে স্বীকৃতি দেয় না। যারফলে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের মেডিকেল গ্রাজুয়েটরা পৃথিবীর অন্যান্য দেশে চাকুরি পায় না। যেসব রাজনীতিবিদ ও প্রফেসর পরোক্ষ এবং প্রত্যক্ষভাবে এসব মেডিকেল ডিগ্রি প্রদানে সহায়তা করেন, তাঁরা ভুলে গেছেন যে, এসব এম বি বি এস (পিস্তল) ডিগ্রিধারী ডাক্তারের ছুড়ির নিচে তাঁকে বা তাঁর আপন জনকে একদিন না একদিন পড়তে হতে পারে। এজন্যই বোধ হয় আমাদের দেশের ভি আই পি’রা, যার মধ্যে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিজেও রয়েছেন, সামান্য চিকিৎৎসার জন্য সিংগাপুর, ব্যাংকক ছুটে যান। ১৯৭৩ সনে প্রবর্তিত বিশ্ববিদ্যালয় আইন দ্বারা পরিচালিত সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দেওয়া ডিগ্রিকে দেশের অভ্যন্তরে আইনের খাতিরে আমরা স্বীকার করি বটে, তবে মানি না। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি দেখিয়ে আজ আর কোথাও চাকুরি পাওয়া যায় না। সরকারি ডিপার্টমেন্টসহ যেকোনো চাকুরিদাতা প্রার্থীকে বিভিন্ন লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিজে বাজিয়ে দেখে তবে চাকুরি দেন। এদিক থেকে বুয়েট এবং কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা অনেকটা ভালো। এদের প্রদত্ত ডিগ্রিকে, আগের মতো বেশি করে না হলেও, এখনও কিছুটা মূল্য দেশে এবং বিদেশে দেওয়া হয়। তবে এদের গ্রাজুয়েটদের একটা বড় দুর্বলতা হলো, কোনো একটা বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান থাকলেও এরা তা ইংরেজিতে প্রকাশ করতে পারে না, বিশেষ করে মৌখিকভাবে। যার জন্য আন্তর্জাতিক চাকুরি বাজারে অনেক সুযোগ থাকা সত্ত্বেও এরা কোনো চান্স পাচ্ছে না। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করা বি আই টি’গুলোর লেখাপড়া এবং পরীক্ষার মান সন্তোষজনক নয়। আমার পরিচিত একটি ছেলে কোনো একটি বি আই টি থেকে সম্প্রতি ইন্জিনিয়ারিংয়ে ফার্স্ট ক্লাস পেয়ে বেরিয়েছে। বহুবার চেষ্টা করেও সে টোফেল পাশ করতে পারেনি। আমি জানি, টোফেলের সাথে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কোনো সম্পর্ক নেই। যা ভেবে আমি বিস্মিত হই তা হলো, আমার জানামতে ডিগ্রি পর্যায়ে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পাঠ্যবই এখনও বাংলা ভাষায় পাওয়া যায় না। এ ছেলে কেমন করে ইংরেজিতে লেখা পাঠ্যবই পাঠ করে এবং তা বুঝে পরীক্ষা দিয়ে, যেনোতেনো ফল নয়, একেবারে ফার্স্ট ক্লাস পেয়ে গেলো? আর যে ছেলে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ফার্স্ট ক্লাস পায় তার কেমন মেধা যে, বারবার পরীক্ষা দিয়ে টোফেল পাশ করতে পারে না?

 

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়

এখন থেকে প্রায় ২৫ বছর আগে, ১৯৯২ সনে, দেশের সকল আন্ডারগ্র্যাড এবং গ্রাজুয়েট লেভেলে সাধারণ শিক্ষা প্রদানকারী কলেজকে বিরাজমান সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমুহের অধিভুক্তি থেকে বের করে আনা হয়। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের, যার সংখ্যা এখন প্রায় দু’হাজারের মতো, শিক্ষা সংক্রান্ত বিষয়সমূহ পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করার জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় নামে একটি একক এফিলিয়েটিং সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়। উদ্দেশ্য মহৎ ছিলো, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু যাঁদের হাতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ভার ছিলো তাঁরা দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ছিলেন, এমনটা বলা যায় না। দু’হাজার কলেজের হাজার হাজার শিক্ষকের পেশাগতো কর্ম এবং লক্ষ লক্ষ ছাত্রের পরীক্ষা পরিচালনা করার জন্য যে জনবল এবং লজিস্টিক প্রয়োজন তার কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। ফলে যা হবার তাই হয়েছে এবং হচ্ছে। নিয়মিত পরীক্ষা নিতে ব্যর্থতা, সেসন জ্যাম, প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া ইত্যাদিসহ হাজারো অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে কলংকে জর্জরিত করছে।

 

প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়


১৯৯২ সনে প্রয়োজনীয় আইন পাশ হবার পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় শ’খানেক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, ইন্জিনিয়ারিং/টেকনিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিকেল কলেজ খোলার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান মোটামুটি দাঁড়িয়েও গেছে। এসব প্রতিষ্ঠান আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলাম ও ক্রেডিট আওয়ার পদ্ধতি অনুসরণ করে বাজারের চাহিদা অনুযায়ী সীমিত সংখ্যক কিছু জনপ্রিয় বিষয়ে আন্ডারগ্রাজুয়েট ও গ্রাজুয়েট প্রোগ্রাম চালিয়ে আসছে। এদের মধ্যে দু’য়েকটি প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা পাশ করে দেশে ও বিদেশে উচ্চতর শিক্ষা ও চাকুরির ক্ষেত্রে কৃতিত্ব দেখিয়ে আসছে। বিত্তবানদের অনেক ছেলেমেয়ে, আগে যারা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কাঙ্খিত বিষয়ে পড়ার সুযোগ না পেয়ে বিদেশে পড়তে যেতো, এখন তারা অধিক সংখ্যায় স্থানীয় প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছে। প্রতিবেশী দেশগুলো থেকেও অনেক ছেলেমেয়ে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছে। ইতোপূর্বে ঢাকায় অবস্থানরত কূটনীতিকসহ বিদেশি যাঁরা তাঁদের ছেলেমেয়েদের, শিক্ষার মাধ্যম বাংলা হবার কারণে এবং ক্যাম্পাসে সন্ত্রাসের কারণে, এদেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে না পেরে অন্য দেশে পাঠাতেন, তাঁরাও এখন এদেশের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ছেলেমেয়ে পাঠাচ্ছেন। এসব  বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্য থেকে অত্যন্ত সীমিত সংখ্যায় হলেও গুণগত মানসম্পন্ন কিছু প্রতিষ্ঠান উঠে আসছে। জাতীয় পর্যায়ে অল্প হলেও কিছু বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হচ্ছে। অত্যন্ত সীমিত সংখ্যায় হলেও কিছু মেধাবী গরিব ছাত্রকে বৃত্তি প্রদানের মাধ্যমে আর্থিক সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। এসব সত্ত্বেও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরুদ্ধে কিছু গুরুতর আভিযোগ রয়েছে। যেসব ব্যক্তি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে অর্থ ব্যয় করেছেন বা করছেন তাঁরা, দু’য়েকজন সম্মানজনক ব্যতিক্রম বাদে, সম্পূর্ণ ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি নিয়ে এ ক্ষেত্রে অর্থ বিনিয়োগ করেছেন। এদের অনেকের বিত্তবান হবার কাহিনী স্বচ্ছ নয়। মুনাফাখোরি মনোবৃত্তি নিয়ে এরা এসব প্রতিষ্ঠানে অর্থ বিনিয়োগ করেছেন। যারফলে শিক্ষার গুণগতো মানের তোয়াক্কা না করে এরা মুনাফা অর্জনে অধিক মনোযোগী। অতি উচ্চ হারে টিউশন ফি এবং অন্যান্য ফি আদায় করে এরা ছাত্রদের এক্সপ্লয়েট করছেন। অধিক সংখ্যক ছাত্র আকর্ষণ করার জন্য শিক্ষকদের বাধ্য করছেন পরীক্ষায় ছাত্রদের প্রাপ্যের অধিক নম্বর প্রদানে। মার্কেট ইকোনমির ভেল্কিবাজি চর্চা করছেন। একথা সত্য, এরা সরকার থেকে কোনো ভর্তুকি বা অনুদান পায় না। জমি ক্রয়, অবকাঠামো নির্মাণ, বাড়ি ভাড়া, শিক্ষক-কর্মচারিদের বেতন, লাইব্রেরি-ল্যাবসহ যাবতীয় সকল খরচ নিজ তহবিল থেকে বহন করে। সেজন্য টিউশন ফি এবং অন্যান্য ফি, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায়, যৌক্তিকভাবে অনেক বেশি হবার কথা। তাই বলে এসব ফি’র নামে মুনাফা করা অবশ্যই অনৈতিক কাজ। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা এবং এর দ্রুত সংখ্যা বৃদ্ধির মূলে যেসব কারণ কাজ করছে তা হলো:

ক।     এখানে কোনো ছাত্র রাজনীতি ও শিক্ষক রাজনীতি নেই।

খ।     এখানে হরতাল-ধর্মঘট নেই। বরং বাইরে আহুত হরতাল ধর্মঘটের কারণে ক্লাস বন্ধ থাকলে ছুটির দিনে ক্লাস চালিয়ে তা পুষিয়ে নেয়া হয়।

গ।     এখানে সেসন জ্যাম নেই। অবশ্যই সময়মতো পাশ করে বেরিয়ে যাবার নিশ্চয়তা আছে।

ঘ।     যদিও এখানে বিত্তবানদের ছেলেমেয়েরা পড়ে তবুও তারা দিনের পর দিন তো দূরের কথা একদিনের জন্যও ক্লাস মিস করে মা-বাবার বিত্ত অপচয় করতে রাজি নয়। এদের সবার স্বপ্ন ও প্রচেষ্টা থাকে কীভাবে তাড়াতাড়ি একটা ভালো রেজাল্ট নিয়ে পাশ করে দেশে পসন্দমতো পেশাতে ঢুকবে, নয়তো দেশের বাইরে আরও উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করতে যাবে।

ঙ। এখানে সাধারণত ভাইস চ্যান্সেলরনিয়োগ দেওয়া হয় মেধা, যোগ্যতা ও সুনামের ভিত্তিতে,  কোনো প্রকার রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়।

চ। অনুরূপভাবে ফ্যাকাল্টি নিয়োগের ক্ষেত্রেও কোনো রাজনৈতিক বিবেচনা কাজ করে না।

ছ। এখানে ছাত্রদের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ক্রেডিট-আওয়ার পদ্ধতিতে গ্রেডিং দেওয়া হয়। যদি কোনো ছাত্র কোর্সের মাঝ পথে অন্য দেশে স্কলারশিপ নিয়ে চলে যায়, বা নিজ খরচে পড়তে যায়, তবে সে তার অর্জিত ক্রেডিট ট্রান্সফার করে নিয়ে যেতে পারে। এতে পড়াশুনা বাধাগ্রস্ত হয় না।

জ। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে (ঢা: বি:’র আই বি এ বাদে) এসব কোনো সুবিধে পাওয়া যায় না।



এখানে বলে রাখা ভালো, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংজ্ঞা অনুযায়ী আমাদের দেশের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সত্যিকার অর্থে বিশ্ববিদ্যালয় নয়। অনেকে মনে করেন যে, বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে স্কুল বা কলেজের মতো জ্ঞান বিতরণের (For propagation of knowledge) সর্বোচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। আসলে তা নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বপ্রধান কাজ হচ্ছে জ্ঞান সৃষ্টি কর। (To create knowledge)। যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জ্ঞান সৃষ্টি হয় না, তাকে বিশ্ববিদ্যালয় বলা যায় না। একইভাবে যেসব কলেজে গ্রাজুয়েট প্রোগ্রাম চালু করেছে সেগুলোকে আমরা ‘বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ’ বলে বাগাড়াম্বর করছি। সেগুলো কলেজ হতে পারে, তবে অবশ্যই বিশ্ববিদ্যালয় নয়। কেননা, সেখানে জ্ঞান সৃষ্টি করা হয় না, শুধুমাত্র জ্ঞান বিতরণ করা হয়। জ্ঞান সৃষ্টি হয় গবেষণার মাধ্যমে। আমাদের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষনা করার জন্য যথেষ্ট অবকাঠামোগতো সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের পেশাগতো কর্মবিমূখতা এবং অযোগ্যতার কারণে (স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক বিবেচনায় অনেক অযোগ্য ব্যক্তিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, এখনও হচ্ছে), এবং সেই সাথে জবাবদিহিতা এবং উৎসাহ না থাকার কারণে আজকাল আর আগের মতো গবেষণা ও জ্ঞান সৃষ্টি হচ্ছে না। দু:খের বিষয়, যেসব বিষয়ের উপর দৈনিক পত্রিকার সম্পাদকীয় স্টাফ প্রবন্ধ লিখতে পারেন, সেসব বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষক অপেশাগত ও রাজনৈতিক প্রবন্ধ ছাপিয়ে সস্তা জনপ্রিয়তা হাসিল করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। একজন বিশ্ববিদ্যারয়ের শিক্ষককে গড়ে তুলতে জাতি যে পরিমান সম্পদ ব্যয় করে, তার প্রতিদানে তাঁর কাছ থেকে জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ পাওনা হলো তাঁর পেশাগতো গবেষণামূলক প্রবন্ধ, অন্য কিছু নয়।

 

মাদ্রাসা শিক্ষা

রাসুলে পাকের (সা:) ইন্তেকালের পর চার শতাব্দিরও বেশি সময়ে মাদ্রাসা শিক্ষা বলতে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কিছু ছিলো না। ইসলামী ধর্মতত্ত্বে আগ্রহী ব্যক্তিরা সে সময়ের রেওয়াজ অনুযায়ী ব্যক্তিগতোভাবে এ বিষয়ের পন্ডিতদের সান্নিধ্যে আগমন করে বিদ্যালাভ করতেন। শিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত চতুর্থ ফাতেমী খলিফা আল-আজিজ বি’ আল্লাহ খৃস্টিয় দশম শতাব্দির শেষ দিকে (৯৭৫-৯৯৬) মিশরের কায়রোতে আল-আযহার স্থাপন করে বিভিন্ন বিষয়ে শিয়া মতানুযায়ী ফতোয়া জারি করতে লাগলেন। সুন্নি মতালম্বীরা যাতে এসব ফতোয়ার বিরোধিতা করতে পারে সে জন্য তৎকালীন আব্বাসীয় প্রধানমন্ত্রী নিযামুল মুলক বাগ্দাদে প্রথম একটি মাদ্রাসা (নিজামিয়া মাদ্রাসা) স্থাপন করেন। পরে মুসলিম বিশ্বে বিভিন্ন স্থানে অনুরূপ মাদ্রাসা স্থাপিত হয়। প্রায় এক’শ বছর আগে ইংরেজরা কলকাতায় আলীয়া মাদ্রাসা স্থাপন করে। পরে ঢাকায়ও অনুরূপ আলীয়া মাদ্রাসা স্থাপিত হয়। প্রতিষ্ঠাতা যে-ই হোক না কেনো, পরবর্তীকালে, সকল মাদ্রাসার পাঠ্যসূচি থেকে যে বিষয়টি ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে তা হলো আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান। শুধু পাঠ্যসূচি থেকে বাদ দিয়েই তারা ক্ষান্ত হয়নি, যারা আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান অধ্যয়ন করে তাদের প্রতি মাদ্রাসার ছাত্রদের মনে তীব্র বিদ্বেষ সৃষ্টি করে, যে প্রক্রিয়া আজও অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে যারা স্কুল-কলেজে পড়ছে তারাও মাদ্রাসার ছাত্রদের প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করে আসছে। আজকাল যেসব ছাত্রের স্কুলে পড়ার মতো আর্থিক সঙ্গতি আছে, এবং সঙ্গতিহীনদের মধ্যে যাদের উচ্চতর মেধার কারণে বৃত্তি বা উপবৃত্তি পাবার সম্ভাবনা আছে, তারা কেউ আর সাধারণত মাদ্রাসায় পড়তে যায় না।



বর্তমানে প্রচলিত মাদ্রাসা পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীর একমাত্র যে মানসিক ক্ষমতার উপর সকল গুরুত্ব আরোপ করা হয়, তা হলো স্মরণশক্তি। আলোচনা, বিতর্ক, অনুসন্ধানী প্রশ্ন করা, খেলাধুলা করা, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের আয়োজন করা মাদ্রাসাতে নিষিদ্ধ। এখানে শিক্ষার্থীর একমাত্র কাজ শোনা, পড়া এবং মুখস্ত করা। শিক্ষার্থীর বুদ্ধিবৃত্তি ও শারীরিক গুণাবলী যাতে বিকশিত না হতে পারে তেমন করে শিক্ষার্থীকে তৈরী করে দেওয়া হয়। সম্ভবত মাদ্রাসাই আধুনিক পৃথিবীতে একমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেখানে শিক্ষার্থীদেরকে স্বীকৃত পদ্ধতি হিসেবে লাঠি দ্বারা প্রহার করা হয়, এবং বিভিন্নভাবে শিক্ষার্থীর শরীর, আত্মসম্মান ও আত্মমর্যাদাকে আঘাত করা হয়। অবৈজ্ঞানিক এবং অনৈসলামিক উপায়ে ইসলাম শিক্ষা দেওয়া হয়।



বর্তমানে অনুসৃত মাদ্রাসা শিক্ষার ফলে দেশে এক ভয়ংকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, এবং ক্রমেই তার অবনতি হচ্ছে। একদিকে স্কুল-কলেজ থেকে পাশ করা এবং অন্যদিকে মাদ্রাসা থেকে পাশ করা পরস্পর বিদ্বেষী দুই শ্রেণীর শিক্ষিত লোক আমাদের সমাজে সৃষ্টি হচ্ছে, যারা কখনও একে অপরকে বন্ধু বলে, ভাই বলে, গ্রহণ করতে পারছে না। এ ধরনের স্থায়ী দ্বিভাজন নিয়ে কোনো সমাজ কোনো ইস্যুতেই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে পারে না। যার প্রমাণ আমরা বাংলাদেশে দেখে আসছি। অপর দিকে এসব কারণে ইসলাম ধর্মেরও ক্ষতি হচ্ছে। পবিত্র কুর’আন, যার রচয়িতা আল্লাহ স্বয়ং নিজে, তার সঠিক ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য যেমন মেধাসম্পন্ন পান্ডিত্যের প্রয়োজন তেমন মেধাসম্পন্ন ছেলেমেয়েরা ইসলামী ধর্মতত্ব পড়তে যাচ্ছে না। নিম্ন মেধাসম্পন্ন মাদ্রাসা শিক্ষকদের হাতে পড়ে কোমলমতি ছেলেমেয়েরা যুক্তিহীন গোঁড়া মতবাদে দীক্ষিত হচ্ছে, যা ইসলাম কখনও সমর্থন করে না।  মাদ্রাসার এসব গ্রাজুয়েটরা অনেক ক্ষেত্রে ইসলামকে ভুল ব্যাখ্যায় প্রচার করছে। কুর’আনসম্মত নয় এমন অনেক ক্ষতিকর মতবাদের সৃষ্টি হচ্ছে। ইসলামের শত্রুরা এর পূর্ণ ফায়দা লুটছে।

 

ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল

বাজারে কোনো পণ্যের চাহিদা এবং সরবরাহের মধ্যে ঘাটতি দেখা দিলে স্বাভাবিকভাবে কালোবাজারীরা আসরে নেমে পড়ে। বাংলাদেশে শিক্ষার বাজারেও তাই হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১.২%(আসল বৃদ্ধির হার এ চাইতে বেশি হবে)। সরকারি স্কুলে ভর্তিচ্ছু প্রার্থীর সংখ্যা একই হারে বাড়ছে। দেশের অর্থনীতির যে অবস্থা তাতে সরকার আগামী ৫০ বছরেও এই ক্রমবর্ধমান ভর্তিচ্ছুদের চাহিদা মেটাতে সক্ষম হবে বলে মনে হয় না। সুতরাং, অন্যান্য পরিসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে যেমন হয়েছে, এক্ষেত্রেও বেসরকারি উদ্যোক্তরা আন্তরিকতা নিয়ে এগিয়ে আসলে দোষের কিছু নেই। কিন্তু সমস্যা হলো, আন্তরিকতার চাইতে মুনাফার দিকে এসব স্কুল মালিকরা বেশি আগ্রহী। পাঠক ক্ষমা করবেন, আবারও একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার উল্লেখ করছি। একবার আদমজী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুলে ইংরেজির শিক্ষক নিয়োগের জন্য পরপর তিনবার পত্রিকায় যথারীতি বিজ্ঞাপন দিয়ে উপযুক্ত প্রার্থী পাইনি। প্রার্থী অনেক এসেছিলো। ধানমন্ডিতে অবস্থিত বিখ্যাত সব ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়াচ্ছে এমন অনেক প্রার্থীও ছিলো। আমার মনে আছে, এর মধ্যে একটি স্কুলে ছাত্র পরিবহণের জন্য প্রায় ষাটটি মাইক্রোবাস চালায় বলে একজন প্রার্থী তথ্য প্রদান করেছিলো। প্রার্থীদের অনেকে ইংরেজিতে এম এ পাশ ছিলো। এদের সাথে কথা বলে মনে হয়েছিলো, এরা বাংলা মিডিয়ামে ইংরেজিতে এম এ পাশ করেছিলো! বাকিদের কথা আর না-ই বা লিখলাম। প্রার্থীদের বেশিরভাগ নিজ নিজ স্কুলে ক্লাস সিক্স-সেভেন পর্যন্ত পড়ায় বলে দাবি করছিলো।(যারা ‘ও’ লেভেলে ইংরেজি পড়ায় তাদের কথা অবশ্য ভিন্ন। তারা আদমজী ক্যান্টনমেন্ট স্কুলে চাকুরি করতে আসবে কোন দু:খে। তারা প্রাইভেট পড়িয়ে মাসে লাখ টাকা আয় করে।) এসব স্কুলে বাংলা ছাড়া আর সব বিষয় ইংরেজিতে পড়ানো হয়। তা’হলে বুঝুন, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ইংরেজির মাস্টারদের যদি এই হাল হয়, তবে অন্যান্য বিষয় কেমন ইংরেজিতে পড়ানো হচ্ছে। অথচ বাইরে থেকে পোজ-পাজ দেখে কিছই বোঝার উপায় নেই। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের একটা বড় দুর্নাম হলো, এরা খুব কেতাদুরুস্ত হলেও আসল লেখাপড়ায় তেমন চৌকশ নয়। ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে। আর এই অতি সামান্য ব্যতিক্রমীরাই ‘ও’ এবং ‘এ’ লেভেলে ভালো রেজাল্ট করে। এসব স্কুলের ফি অযৌক্তিকভাবে বেশি। তাছাড়া ছাত্রদের অনেক বেশি টাকার বিনিময়ে মাস্টারদের কাছে প্রাইভেট পড়তে হয়। বছরে একটি ছাত্রের পেছনে গড়ে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা বা তার বেশি ব্যয় করতে হয়।



ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ুয়াদের বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ হলো, এরা স্বদেশকে ভালোবাসতে শেখে না, নিজের পরিবেশ এবং সমাজ সম্পর্কে উদাসীন থাকে। এরা নিজ গৃহে পরবাসীর মতো বসবাস করে। এরা শুধু তালে থাকে কখন দেশ ছেড়ে বিদেশে পারি জমাবে। এসব সত্বেও ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোর একটা উল্লেখযোগ্য ভালো দিক হলো, পাঠ্যসূচির কারণে ‘ও’ এবং ‘এ’ লেভেলে এদের শিক্ষার উচ্চতর গুণগত মান। এই দু’টো পরীক্ষার পাঠ্যসূচি নির্ধারণ, পরীক্ষার সময়সূচি নির্ধারণ, প্রশ্নপত্র প্রনয়ণ, উত্তরপত্র পরীক্ষা, ফলাফল প্রকাশ ইত্যাদি সবকিছু করে থাকে যুক্তরাজ্যের লন্ডন বা কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটির স্কুল এক্সামিনেশন বোর্ড।(ভাগ্যিস, এখানে বাংলাদেশের শিক্ষা বোর্ডগুলোর কোনো ভূমিকা নেই!) এখানে প্রশ্নপত্র ফাঁস হবার, নকল করার, পরীক্ষার সময় পেছানোর, পরীক্ষকের বাড়ি গিয়ে নম্বর বাড়ানোর তদবির করা ইত্যাদি কোনো কিছু করার সুযোগ নেই। যদিও সরকারিভাবে ‘ও’ এবং ‘এ’ লেভেলের মানকে যথাক্রমে আমাদের জাতীয় শিক্ষাধারার এস এস সি এবং এইচ এস সি-এর সমমানের ধরা হয়, আসলে এ দু’টি পরীক্ষার মান তার চাইতে অনেক উঁচু। বাস্তবে আমাদের এইচ এস সি-এর পাঠ্যসূচির মান ’ও’ লেভেলের পাঠ্যসূচি থেকে নিম্ন মানের। ‘এ’ লেভেলের মানের রয়েছে দুনিয়াজোরা স্বীকৃতি। ‘এ’ লেভেল পাশ করে পৃথিবীর যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া সম্ভব। ‘এ’ লেভেল পাশ থাকলে টোফেল, আই ই এল টি এস, স্যাট, এসব পরীক্ষায ভালো করা সহজ হয়। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলো আছে বলে এখনও আমাদের দেশ থেকে কিছু ছেলেমেয়ে বৃত্তি পেয়ে বা নিজ খরচে আমিরিকা, কেনাডা, অস্ট্রেলিয়া বা ইংল্যান্ডের মতো দেশে আন্ডারগ্রাজুয়েট লেভেলে পড়তে যেতে পারছে।

 

বাংলা মিডিয়াম স্কুলে ইংরেজি শিক্ষা


বাংলা মিডিয়াম স্কুলে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত দ্বিতীয় ভাষা এবং অন্যতম প্রধান (২০০ নম্বরের) আবশ্যিক বিষয় হিসেবে ইংরেজি ভাষা পড়ানো হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, পড়ানো হলেও শেখানো হয় না। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাশ করা ৯৮% শিক্ষার্থী নিজে নিজে কোনো বিষয়ের উপর ইংরেজিতে পরপর পাঁচটি বাক্য শুদ্ধভাবে লিখতে পারে না। কোনো ইংরেজি দৈনিক পত্রিকা পড়ে তার অর্থ বলতে পারে না। যদিও এদের মধ্যে অনেকে পরীক্ষায় ইংরেজিতে ‘এ’ গ্রেড লাভ করে। এমন পরিস্থিতির জন্য ছাত্রদেরকে দায়ি করা যায় না। দায়ি হলো, আমাদের স্কুল-কলেজে ইংরেজি শিক্ষাদানের ব্যবস্থা। আগে বি এ ক্লাসের সিলেবাসে ইংরেজি ভাষা বাধ্যতামূলক বিষয় ছিলো। তখন বি এ পাশ করে অনেকে স্কুলে গিয়ে ইংরেজির শিক্ষক হতো। অনেক পরীক্ষার্থী বিষয়টিতে ফেল করা শুরু করলে জে: এরশাদের সরকার বি এ ক্লাসের সিলেবাস থেকে ইংরেজি উঠিয়ে দিলো। কোনো দেশের সরকার সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য এমন আত্মঘাতি পদক্ষেপ নিতে পারে, তা কল্পনা করা যায় না। গায়ে জামা ছোটো হচ্ছে বলে, প্রয়োজন অনুযায়ী বড় জামা না বানিয়, গায়ের গোস্ত কেটে ফেলে জামা ফিটিং করার মতো অবস্থা। বাংলাভাষা আমাদের মায়ের মতো। এর প্রতি আমাদের ভালোবাসা ও আনুগত্য শর্তহীন। অন্যদিকে, প্রয়োজনীয়তার আলোকে বিচার করলে, ইংরেজি ভাষা আমাদের খালার মতো। মাকে ভালোবাসতে হলে খালাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিতে হবে, এটা কেমন যুক্তি। বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে বিদেশে ব্যবসা-বানিজ্য, চাকুরি-বাকুরি, লেখাপড়া করে টিকে থাকার জন্য যখন আমাদের প্রয়োজন বেশি করে ইংরেজি ভাষা (সাহিত্য নয়) শেখা, তখন আমরা ইংরেজি ভাষা যাতে স্কুল পর্যায়ে পড়ানোর জন্য কাউকে আর দেশে না পাওয়া যায় সে ব্যবস্থা করে ফেললাম। যার ফল এখন আমরা হাড়েহাড়ে টের পাচ্ছি। এখন যদি আমরা আমাদের ছেলেমেয়েদের স্কুলে ভালোভাবে ইংরেজি ভাষা শেখাতেও চাই, তার জন্য মাস্টার পাবো কোথায়? শহরে দু’একজন পাওয়া গেলেও,  ইংরেজিতে অনার্স বা মাস্টার্স করে কেউ তো আর গ্রামে গিয়ে স্কুলে মাস্টারি করবে না।

এডিটরনোট:    0

প্রকাশিত সব তথ্য আর মতামত লেখকের আর মন্তব্য কারীর ব্যক্তিগত, সাইয়েন্টিফিক বাংলাদেশের নয়। সাইয়েন্টিফিক বাংলাদেশ আইনগত বা অন্য কোন দায় গ্রহণ করবে না তথ্যের সঠিকতা বা পাঠকের মন্তব্যের জন্য।

Rate it :12345
Tell a Friend
 
Loading... Please wait...