এই কৌশলগত প্রতিবেদনটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বিগত তিন দশকের গবেষণা কার্যক্রমের একটি গভীর বিশ্লেষণ। স্কোপাস (Scopus) ডেটাবেসের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রণীত এই মূল্যায়নটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশ্বিক অবস্থান, গবেষণার গুণগত মান এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পথরেখা নির্দেশ করে।
১. গবেষণা আউটপুট এবং প্রবৃদ্ধির গতিধারা (Research Output and Growth Trends)
একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক প্রভাব এবং দৃশ্যমানতা পরিমাপের মৌলিক অনুঘটক হলো তার গবেষণার পরিমাণ বা আউটপুট। এটি কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং আন্তর্জাতিক গবেষণা পরিমণ্ডলে প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি এবং বৈশ্বিক জ্ঞান বিনিময়ে এর অংশগ্রহণের প্রতিফলন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে দেখা যায়, ১৯৯৬ থেকে ২০২৭ (যেখানে ২০২৬-২৭ সময়কালটি প্রক্ষেপিত বা অসম্পূর্ণ বছরের উপাত্ত হিসেবে গণ্য) পর্যন্ত মোট ১৬,৮২৫টি প্রকাশনা সম্পন্ন হয়েছে।
- সামগ্রিক স্কলারলি আউটপুট: ১৬,৮২৫টি প্রকাশনা।
- মোট ভিউ সংখ্যা: ৫৫১,৬৭৫টি।
- প্রকাশনা প্রতি ভিউ (Views per Publication): ৩২.৮।
কৌশলগত বিশ্লেষণ: ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকের তুলনায় বর্তমান প্রকাশনা হার কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রমবর্ধমান গবেষণা সক্ষমতার পরিচয় দেয়। বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, প্রকাশনা প্রতি ৩২.৮ ভিউ সংখ্যাটি একটি “লিডিং ইন্ডিকেটর” বা অগ্রবর্তী সূচক হিসেবে কাজ করছে। এটি নির্দেশ করে যে বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ব্যাপকভাবে পঠিত ও অনুসৃত হচ্ছে, যা আগামী ২০২৬-২০২৮ চক্রে সাইটেশনের একটি বড় উল্লম্ফন বা “Citation Surge” ঘটার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এই প্রবৃদ্ধি বিশ্ববিদ্যালয়কে আঞ্চলিক গণ্ডি ছাড়িয়ে বৈশ্বিক একাডেমিক নেতৃত্বে আসীন করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।
পরিমাণগত এই প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও, এর গুণগত প্রভাব বিশ্লেষণ করা এখন সময়ের দাবি।
২. সাইটেশন প্রভাব এবং বৈশ্বিক মানদণ্ড (Citation Impact and Global Benchmarks)
গবেষণার প্রভাব মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কেবল কাঁচা সাইটেশন সংখ্যা (Raw Citation Count) যথেষ্ট নয়; বরং ‘ফিল্ড-ওয়েটেড সাইটেশন ইমপ্যাক্ট’ (FWCI) একটি সূক্ষ্মতর বৈশ্বিক মানদণ্ড। এটি নির্দিষ্ট বিষয়ের বৈশ্বিক গড় সাইটেশনের সাপেক্ষে একটি প্রতিষ্ঠানের গবেষণার মান নির্ধারণ করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক সাইটেশন পারফরম্যান্স নিম্নরূপ:
- মোট সাইটেশন সংখ্যা: ৪১১,৭৭২।
- ফিল্ড-ওয়েটেড সাইটেশন ইমপ্যাক্ট (FWCI): ১.৬২ (অর্থাৎ বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে ৬২% বেশি প্রভাব)।
- প্রকাশনা প্রতি গড় সাইটেশন: ২৪.৫।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট প্রকাশনার ১৩.২% (২,২২৪টি গবেষণাপত্র) বিশ্বের শীর্ষ ১০% সর্বাধিক সাইটেশন প্রাপ্ত তালিকার অন্তর্ভুক্ত। বিশেষভাবে ‘দ্য ল্যানসেট’ জার্নালে প্রকাশিত “Global Burden of Disease” সংক্রান্ত গবেষণাগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের FWCI বৃদ্ধিতে এককভাবে বড় ভূমিকা রেখেছে। তবে কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে, এই মেগা-কোলাবোরেশনগুলো (যেখানে শত শত গবেষক যুক্ত থাকেন) অনেক সময় স্বতন্ত্র বিভাগীয় গবেষণার প্রকৃত সক্ষমতাকে আড়াল করতে পারে। তাই দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতার জন্য বিভিন্ন ক্লাস্টারে স্বাধীন উচ্চ-প্রভাবশালী গবেষণার বিস্তার ঘটানো প্রয়োজন।
শীর্ষ ৩টি সর্বাধিক সাইটেশন প্রাপ্ত প্রকাশনা:
|
প্রকাশনার শিরোনাম
|
বছর
|
মোট সাইটেশন
|
FWCI
|
|---|---|---|---|
|
Global burden of 369 diseases and injuries in 204 countries and territories, 1990–2019: a systematic analysis for the Global Burden of Disease Study 2019
|
২০২০
|
১৫,১২৯
|
৪৮০.৩৮
|
|
Global, regional, and national incidence, prevalence, and years lived with disability for 354 Diseases and Injuries for 195 countries and territories, 1990-2017
|
২০১৮
|
১১,৮৪০
|
৪৪২.৯৫
|
|
Global burden of 87 risk factors in 204 countries and territories, 1990–2019: a systematic analysis for the Global Burden of Disease Study 2019
|
২০২০
|
৯,৪৭৩
|
৩১৪.৩৪
|
গবেষণার এই প্রভাব কেবল সাইটেশনে সীমাবদ্ধ নয়, এটি কোন মানের জার্নালে প্রকাশিত হচ্ছে তার ওপরও নির্ভর করে।
৩. জার্নাল গুণমান এবং প্রকাশনার কৌশল (Journal Quality and Publication Strategy)
প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা রক্ষায় উচ্চ-কোয়ার্টাইল (Q1 এবং Q2) জার্নালে প্রকাশনা একটি কৌশলগত অগ্রাধিকার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা ধারাবাহিকভাবে মানসম্মত জার্নালে তাদের কাজ প্রকাশ করছেন, যা দীর্ঘমেয়াদী একাডেমিক নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করে।
- প্রকাশনার বন্টন (Journal Quartiles):
- Q1 to Q2 (শীর্ষ ৫০% জার্নাল): ৭২.৮% (৯,৮১০টি প্রকাশনা)।
- Q1 to Q3 (শীর্ষ ৭৫% জার্নাল): ৮৯.৯% (১২,১১৬টি প্রকাশনা)।
- শীর্ষ জার্নাল উপস্থিতি: ১৫.৮% প্রকাশনা বিশ্বের শীর্ষ ১০% এসজেআর (SJR) র্যাঙ্কিংভুক্ত জার্নালে স্থান পেয়েছে।
এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে ঢাবির অধিকাংশ গবেষণা আন্তর্জাতিক মানের কঠোর পিয়ার-রিভিউ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই উচ্চমানের প্রকাশনা কৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক বৈশ্বিক ভাবমূর্তি গঠনে মৌলিক অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। এই সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষস্থানীয় একদল গবেষক।
৪. শীর্ষ গবেষক এবং একাডেমিক নেতৃত্ব (Top Authors and Academic Leadership)
একটি প্রতিষ্ঠানের গবেষণার সংস্কৃতি টেকসই করার জন্য অভিজ্ঞ অনুষদ সদস্যদের মেন্টরশিপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২১-২০২৫ সময়কালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পাঁচ গবেষক কেবল প্রকাশনার সংখ্যায় নয়, বরং একাডেমিক নেতৃত্বেও অসামান্য অবদান রেখেছেন।
শীর্ষ ৫ গবেষক (২০২১-২০২৫):
|
গবেষকের নাম
|
মোট আউটপুট
|
মোট সাইটেশন
|
এইচ-ইনডেক্স (h-index)
|
|---|---|---|---|
|
মোহাম্মদ ফেরদৌস (Mohammad Ferdows)
|
৯৬
|
৮৩৪
|
৩০
|
|
মো. আফতাব আলী শেখ (Md Aftab Ali Shaikh)
|
৯২
|
১,৭৭২
|
২৮
|
|
এম. রেজাউল ইসলাম (M. Rezaul Islam)
|
৭৪
|
২৯৩
|
২২
|
|
এম. এ. বি. এইচ. সুসান (M. A.B.H. Susan)
|
৬৫
|
১,৪৯৯
|
৩৮
|
|
আবদুস সালাম (Abdus Salam)
|
৬৩
|
১,০৬৩
|
৩৩
|
এই নেতৃস্থানীয় গবেষকদের উচ্চ এইচ-ইনডেক্স (যেমন এম. এ. বি. এইচ. সুসান-এর ৩৮) আন্তর্জাতিক সহযোগিতামূলক গবেষণায় ঢাবিকে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা প্রদান করে। উল্লেখ্য যে, আনিচুর রহমান (তালিকার ৮ম অবস্থানে থাকা সত্ত্বেও) ২,৬০৩টি সাইটেশন পেয়ে একজন “High-impact outlier” হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এই পর্যায়ের ব্যক্তিগত দক্ষতা সরাসরি বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রার সাথে গবেষণার সংযোগ ঘটায়।
৫. গবেষণা ক্লাস্টার এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (Research Clusters and SDG Alignment)
বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা যখন বৈশ্বিক সংকট সমাধানে ভূমিকা রাখে, তখন তার গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) অর্জনে কার্যকর অবদান রাখছে।
শীর্ষ গবেষণা ক্লাস্টার এবং প্রভাব:
- Image Segmentation, Deep Neural Networks: এই ক্লাস্টারে ঢাবি বিশ্বের ১০০তম পার্সেন্টাইলে (100.000) অবস্থান করছে, যা একটি অসামান্য বৈশ্বিক অর্জন।
- COVID-19 এবং টিকাদান: এর FWCI মান ৬.৭৭, যা আন্তর্জাতিক মানে অত্যন্ত শক্তিশালী।
- Adsorption Mechanisms: ৯৭.৭১১ প্রমিনেন্স পার্সেন্টাইল এবং ৬.০১ FWCI নিয়ে এটি একটি শীর্ষস্থানীয় ক্ষেত্র।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) বিশ্লেষণ: ১. SDG 2 (ক্ষুধামুক্তি): আউটপুট কম হলেও এর FWCI ৪.৭২, যা একটি “নিশ পিক” (Niche Peak) বা বিশেষায়িত উৎকর্ষের ক্ষেত্র নির্দেশ করে। ২. SDG 3 (সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ): সর্বাধিক ৩,১৮১টি প্রকাশনা এবং ৩.৪৭ FWCI। ৩. SDG 16 (শান্তি, ন্যায়বিচার ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান): ৪৪৬টি প্রকাশনা এবং ৩.৫৯ FWCI।
এই থিম্যাটিক শক্তিগুলো সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশ্বিক র্যাঙ্কিংয়ের সূচকগুলোকে প্রভাবিত করে।
৬. বৈশ্বিক র্যাঙ্কিং এবং কৌশলগত অবস্থান (Global Rankings and Strategic Positioning)
স্কোপাস-ভিত্তিক সূচকগুলো কিউএস (QS) এবং দ্য (THE) ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাঙ্কিংয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থানের মূল ভিত্তি। উল্লেখ্য যে, QS 2026 র্যাঙ্কিং মূলত ২০২৪/২৫ পর্যন্ত সংগৃহীত উপাত্তের প্রতিফলন।
র্যাঙ্কিং ও স্কোর সারসংক্ষেপ:
|
র্যাঙ্কিং মাধ্যম
|
অবস্থান / স্কোর
|
|---|---|
|
QS World University Rankings 2026
|
৫৮৪তম
|
|
THE World University Rankings 2026
|
৮০১–১০০০
|
|
THE Impact Rankings 2025
|
১০০১–১৫০০
|
|
Sustainability Score (QS)
|
৫৪.২
|
|
Citations per Faculty Score (QS)
|
৬.৯
|
কৌশলগত পর্যবেক্ষণ: বিশ্ববিদ্যালয়ের টেকসই অবস্থান (Sustainability Score ৫৪.২) প্রশংসনীয় হলেও “Citations per Faculty Score” (৬.৯) অত্যন্ত কম। এটি একটি কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা নির্দেশ করে—বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে “Reputation-heavy but impact-light” অবস্থায় রয়েছে। অর্থাৎ বৈশ্বিক পরিচিতি বাড়লেও ফ্যাকাল্টি পর্যায়ে উচ্চ-প্রভাবশালী প্রকাশনার হার এখনো বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার তুলনায় পিছিয়ে।
উপসংহার
গত ৩০ বছরের পরিক্রমায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি আঞ্চলিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বিশ্বমানের গবেষণা কেন্দ্রে রূপান্তরিত হওয়ার পথে অনেক দূর এগিয়েছে। ১৬,৮২৫টি প্রকাশনা এবং ১.৬২ FWCI মান নিশ্চিত করে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার গুণমান বৈশ্বিক গড়ের উর্ধ্বে।
তবে বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষ ৫০০-এর ভেতরে স্থায়ী অবস্থান নিশ্চিত করতে হলে কেবল ল্যানসেট-নির্ভর সাইটেশনের ওপর নির্ভর না করে প্রতিটি অনুষদ থেকে উচ্চ-প্রভাবশালী এবং আন্তর্জাতিক কোলাবোরেশন বৃদ্ধির সুনির্দিষ্ট কৌশল গ্রহণ করতে হবে। বর্তমানের উচ্চ “Views per Publication” হারটিই হতে পারে আগামী দিনের বৈশ্বিক সাফল্যের চাবিকাঠি।
N.B: Scopus databased report by NoteBookLM


